মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর অবদান অসামান্য। তিনি ১৯২০ সালে জন্মগ্রহণ করে ত্াঁর স্বল্প জীবনে একাধারে বৃটিশ আন্দোলন, পাকিস্তান আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি ক্ষেত্রে অসামান্য ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতা ও মানবকল্যাণের জন্য তিনি অসংখ্যবার কারাবরণ করেন। আগরতলা ষঢ়যন্ত্র, ৬-দফা আন্দোলন ও স্বাধীনতাযুদ্ধ ‘৭১-সহ সকল আন্দোলনে তিনি সেনাপতির ভূমিকা পালন করেন। দেশের সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালিকে যার যা আছে তাই নিয়ে লড়াই করার আহবান করেন। তার আহবানে সাড়া দিয়ে দেশের প্রতিটি জনতা সর্বাত্মক সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং লাখো প্রাণ বিসর্জন ও আত্মদানের বিনিময়ে বিজয় ছিনে আনেন। এভাবে বঙ্গবন্ধু পরিণত হন স্বাধীনতা ও বিজয়ের একক পুরোধা হিসেবে। দেশের মানুষ তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ এবং ‘বাঙ্গালি জাতির জনক’ খেতাব দেন।
২৪ মার্চ, ১৯৭১-এ বঙ্গবন্ধু ও পাকিস্তান সামরিক সরকারের মধ্যকার সমঝোতা বৈঠক ব্যর্থ হলে যুদ্ধের আবহ শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু তার সহকর্মীদেরকে আত্মগোপনে যাবার বা ভারতে প্রস্থানের নির্দেশ দেন। তাজউদ্দিন আহমদসহ প্রায় সকল নেতৃবৃন্দ একইভাবে বঙ্গবন্ধুকেও আত্মগোপনের পরামর্শ দেন। তারা বঙ্গবন্ধুকে হাত ধরে অনুরোধ করেন এবং হাউ-মাউ করে কান্না-কাটিও করেন। অনেকে বারবার ফোন করেও অনুরোধ করেন। সকল অনুরোধ ও কান্না-কাটি উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট জবাব দেন, ‘তোমরা পালাও, কিন্তু আমি শেখ মুজিব পালাতে পারিনা। আমি পালালে, পাকবাহিনী শুধু আমাকে খোঁজার নামে বাংলার সাধারণ মানুষকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করবে। তাই বাংলার মানুষের জন্য আমি আমার জীবন উৎসর্গ করছি।’ এ মহান চেতনা ধারণ করে বঙ্গবন্ধু তাঁর একান্ত সহকর্মী ড. কামাল হোসেনসহ পাকবাহিনীর জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে তিনি অবরূদ্ধ হন।
এখান থেকেই মুক্তিযুদ্ধে রাজাকারি চেতনার জন্ম হয়। পাকবাহিনী কোনো এলাকায় অভিযান শুরু করলে, বঙ্গবন্ধুপ্রেমী সচেতন ব্যক্তিবর্গ উক্ত রাজাকারি চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে নিজেদের জীবনের মায়া ত্যাগ করে সামনে এগিয়ে আসেন। তারা পাকবাহিনীকে আশ্বস্ত করেন, তদীয় এলাকায় পাকিস্তান বিরোধী কেউ নেই। এভাবে তারা দিনে পাকবাহিনীকে সহযোগীতা করেন, আর রাতে তাদেরই বিরূদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। তারা অসহায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের প্রাণরক্ষাসহ স্বাধীনতা আন্দোলনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধে তাদের মধ্য থেকেই ত্রিশ লাখ শহীদ হন এবং দুই লাখ নারী সম্ভ্রম হারান। তারা বঙ্গবন্ধুর মহান রাজাকারি আদর্শে উজ্জীবিত এক একজন বীর সেনা ও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। তারা যুদ্ধকালে ভারতপ্রবাসী তথা প্রশিক্ষণের নামে তথায় অবস্থানকারী রাজাকারদের তুলনায় অনেক গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু স্বাধীনতার পর এ সকল বঙ্গবন্ধুপ্রেমী যোদ্ধাগণ ভারতীয় রাজাকারদের বিশেষ ক্যু’য়ের ফলে ‘পাকিস্তানী রাজাকার’ সাব্যস্ত হন। তারা বঙ্গবন্ধুর মতোই মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হন।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সুস্পষ্টভাবে এদেশের সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালি, তাদের ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোন প্রত্যেককে ‘সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা’ স্বীকৃতি দেন। তিনি নিজেও ‘সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা’ পরিচয় দেন। মাত্র ৬৭৬ জন বিশিষ্ট যোদ্ধাকে তিনি খেতাব প্রদান করেন। আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের সমর্থন ও খুনী পাকিস্তানী সামরিক জান্তার বিচারের উদ্দেশ্যে তিনি কথিত দালাল আইনে বিচারও শুরু করেন। সিমলা চুক্তির ফলে বিশেষ উদ্দেশ্য ব্যর্থ হওয়ায়, বঙ্গবন্ধু স্বয়ং উক্ত বিচার প্রক্রিয়া বাতিলসহ তথাকথিত দালালদেরকে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি প্রদান করেন। ফলে বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে দেশে মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিভাজন সৃষ্টি হয়নি। এবং মুক্তিযোদ্ধা কোটা নামে বৈষম্যমূলক কোনো কোটানীতিও চালু হয়নি।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর অসাধু রাজনীতিবিদগণ বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে মাত্র দুই লাখ তথাকথিত ভারতীয় রাজাকারদেরকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। তাদেরকে মুক্তিযোদ্ধা কোটাভুক্ত করে দেশে অন্যায় বৈষম্য সুষ্টি করে। এতে বঙ্গবন্ধু ও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি বা আত্মত্যাগ আড়াল হয়ে যায়। কে মুক্তিযোদ্ধা, কে রাজাকার তা নির্ণয় করা দুঃসাধ্য হয়। এতে প্রশ্ন ওঠে, মুক্তিযু্েদ্ধ বঙ্গবন্ধুর অবদান অনুসারে তার নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নেই কেন? বঙ্গবন্ধু কি মুক্তিযোদ্ধা নন? এখন বঙ্গবন্ধুকে মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত করলে, ১৯৭১ এর সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীকেও মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করতে হবে। ত্রিশ লাখ শহীদসহ সকল বন্দী ও শরণার্থীদেরকেও মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দিতে হবে। বর্তমানে প্রচলিত অবৈধ মুক্তিযোদ্ধা কোটানীতি বাতিল করতে হবে। দেশের ষোলকোটি নাগরিক সবাইকে ৭১ এর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্য হিসেবে ঘোষণা করতে হবে।
অতএব, বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ বাংলাদেশের ষোল কোটি নাগরিকের কাছে আমার জিজ্ঞাসা, মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি কি? এবং তাকে মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত করা হবে কিনা?
এ্যাডভোকেট, ঢাকা। সৎসড়ংঃধশ৭৮৬@মসধরষ.পড়স.

No comments:
Post a Comment