Sunday, March 13, 2016

পক্ষে নয়, মুক্তিযুদ্ধে বিপক্ষে কাজ করেছেন রাগীব আলী-সিলেটের মুক্তিযোদ্ধারা |অগ্রদৃষ্টি.কম

সিলেট প্রতিনিধিঃ  রাগীব আলী। নামটি সংক্ষিপ্ত হলেও সিলেটের কথিত এ ‘দানবীরে’র নামের আগে যুক্ত হওয়া বিশেষণের তালিকা খুবই দীর্ঘ। সুবিধাভোগী ও তোষামোদকারীদের দিয়ে এসব বিশেষণ যুক্ত করান তিনি। এর একটি হল- ‘মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক’। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রবাসে থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাজ করেছিলেন জানিয়ে এ দাবি। কিন্তু এতে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সিলেটের মুক্তিযোদ্ধারা।

তারা বলছেন, পক্ষে নয়, মুক্তিযুদ্ধে বিপক্ষে কাজ করেছেন রাগীব আলী। মুক্তিযোদ্ধাদের কথার প্রতিধ্বনি বিশ্বের ২৬১ ভাষায় প্রকাশিত ইন্টারনেটভিত্তিক মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়াতেও। এর বাংলা সংস্করণ বলছে, ‘রাগীব আলী সম্পর্কে বেশ কিছু অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের সময় বিদেশে থেকে দেশের বিরুদ্ধে কাজ করা, যুদ্ধাপরাধীদের সহায়তা করা ও হিন্দুদের দেবোত্তর সম্পত্তি দখল প্রভৃতি।’

অনুসন্ধানে দেখা যায়, জামায়াতের সংগঠন আঞ্জুমানে আল ইসলাহ’র প্রধান পৃষ্ঠপোষক রাগীব আলী। যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযুক্ত মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে এরশাদ (হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ) সরকারের আমলে সিলেটে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে প্রতিরোধের ডাক দেয়া হয়। মুক্তিযোদ্ধা-জনতাসহ প্রগতিশীল শক্তির নেতৃত্বে সর্বস্তরের সিলেটবাসীর এই প্রতিরোধ কর্মসূচি মোকাবেলা করার সাহস পায়নি জামায়াত-শিবির। কিন্তু রাগীব আলী সিলেটবাসীকে চ্যালেঞ্জ করে মাঠে নামেন। অবাঞ্ছিত সাঈদীকে বিমানে সিলেট নিয়ে আসা, কামালবাজারে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা এবং নিজ মালিকানাধীন মালনীছড়ায় আতিথেয়তার ব্যবস্থা করেন রাগীব আলী। মুক্তিযোদ্ধা-জনতাসহ সিলেটবাসীকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে ‘ম্যাজিকের ঘোড়া’ হিসেবে ব্যবহৃত হন স্বাধীনতাবিরোধীদের।

সেই রাগীব আলীর মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক দাবি করা নিয়ে বিস্মিত মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, মুক্তিযোদ্ধাসহ সচেতন মহল। জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েল বলেন, রাগীব আলী আপাদমস্তক একজন স্বাধীনতাবিরোধী। মুক্তিযুদ্ধে ছিলেন দেশবিরোধী ও রাজাকার-আলবদরদের সহযোগী। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও সিলেট ও বিলেতে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে তিনিই পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, পৃষ্ঠপোষক দূরের কথা, রাগীব আলী জামায়াত-শিবির ছাড়াও জঙ্গিদের অর্থ জোগানদাতা। সঠিক তদন্ত হলে আরও অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসবে।

ক্ষমতার স্রোতমুখী ও দ্রুত বদলাতে অভ্যস্ত রাগীব আলী নিজের অপরাধ ঢাকতে স্বাধীনতা-পরবর্তীতে দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা ও পুনর্বাসনে কিছু কাজ করেন। নামের আগে তখনই যোগ করেন নতুন বিশেষণ ‘মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক’। আর এই বিশেষণ প্রায় প্রতিদিনই ছাপা হতে থাকে তারই মালিকানাধীন স্থানীয় এক দৈনিকে। এমনকি দ্রুত বদলে যাওয়ায় বিশ্বাসী রাগীব আলী গ্রামবাসীর বিরোধিতার মুখেও নিজ গ্রামের নামও বদলে নিয়েছেন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত বছর থেকে রাগীব আলী নামের আগে ‘সৈয়দ’ পদবি ব্যবহার করছেন। এর আগে নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘ড.’। যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধীদের বিচার নিয়ে তোড়জোড় শুরু হলে নামের আগে ‘মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক’ ব্যবহার বেড়ে যায় তার।

নিজের মালিকানাধীন স্থানীয় পত্রিকায় ‘যুগশ্রেষ্ঠ দানবীর’, ‘উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ দানবীর’, ‘মানবসেবায় কিংবদন্তি’ এসব বিশেষণ ব্যবহৃত হয় অহরহ। রাগীব আলীর মালিকানাধীন ওই দৈনিকটি ঘেঁটে এমন বাহারি বিশেষণের সন্ধান মিলে।

ওই পত্রিকায় রাগীব আলীকে আখ্যা দেয়া হয় ‘সমাজসেবামূলক অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, বরেণ্য শিল্পপতি, প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, শিল্প সাহিত্য ও সাংবাদিকতার পৃষ্ঠপোষক, মানবকল্যাণে নিবেদিত প্রতিষ্ঠান রাগীব রাবেয়া ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, দানবীর, সিলেটের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় লিডিং ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, দেশের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক চেয়ারম্যান, দেশের অন্যতম বাণিজ্যিক ব্যাংক সাউথ ইস্ট ব্যাংকের অন্যতম উদ্যোক্তা ও সাবেক চেয়ারম্যান, শিক্ষানুরাগী, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মৌলভীবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, সফল চা শিল্প উদ্যোক্তা, সিলেটের প্রথম বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি ক্রীড়া একাডেমি রাগীব-রাবেয়া বাংলাদেশ স্পোর্টস একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক চেয়ারম্যান, রাগীব-রাবেয়া সাহিত্য পদকের প্রবর্তক, সমাজহিতৈষী, অসংখ্য মানবসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা’ বলে। সময় ও প্রয়োজন বুঝে এসব বিশেষণ ব্যবহার করা হয়। - যুগান্তর 

No comments:

Post a Comment