Thursday, March 3, 2016

বইমেলা শেষ, রয়ে গেলো স্মৃতি!

আরিফ চৌধুরী শুভ (সাংবাদিক ও লেখক)   ২৯ ফেব্রুয়ারি রাত ৮ টায় পর্দা নামলো ২০১৬  অমর একুশের বইমেলার। সেই সাথে স্মৃতির পাতায় যুক্ত হলো আরও একটি বইমেলার অভিজ্ঞতা। প্রতিবছরের চেয়ে এবারের মেলায় বাড়তি নিরাপত্তার পাশাপাশি ছিল অনেক ব্যতিক্রমতা। মেলার সাজ সজ্জাও ছিল অনেক আকর্ষণীয় ও বইমেলা প্রাসঙ্গিক। বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দীর স্টলগুলোতেও ছিল নবীন প্রবীন লেখক ও পাঠকদের উচ্ছাসিত সমাগম।

শিশু কিশোর প্রবীণ সব বয়সী মানুষই এসেছে মেলায়। কেউ এসেছে প্রাণের টানে, কেউ আবার সখের বসে। কেউ এসেছেন হৃদয়ের শূণ্যতাকে অনুভব করতে। খালি হাতে কেউ যে ফিরে যাননি তার প্রমাণ বাংলা একাডেমির দেওয়া তথ্যে। ২০১৬ সালের বইমেলাতে প্রায় ৪১ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে । বইয়ের প্রতি বাঙ্গালীর এই অভিসার দেখে মুগ্ধ না হয়ে আর পারছি না। সেই সাথে ভাবছি সৈয়দ মুজতবা আলীর বাণীটি ‘‘বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না’’। ডিজিটাল বাঙ্গালীর জীবনে সময়ের বড়ই অভাব। আশা করি সেল্পের মাধ্যে বইগুলো ব্যক্তিত্ব প্রকাশে সারি হয়ে ঘুণে ধরার আগেই অন্তত অবসরে হলেও  পাঠাকের মাথায় জ্ঞানের সারি হয়ে থাকবে। নিজের শুভ বুদ্ধির জন্য হলেও বইয়ের পাতায় একবার করে হাত বুলাবেন পাঠক।

২০১৬ এর ফেব্রুয়ারি মাস অধিবর্ষে হওয়ায় অন্য বছরের চেয়ে মেলার একদিন বেশি পেয়েছেন পাঠক, লেখক এবং প্রকাশকরা। এরকম আরেকটি ২৯ ফেব্রুয়ারি পেতে হলে সবাইকে অপেক্ষা করতে হবে আরও ৪ বছর। তাই ৪ বছরের অপেক্ষায় না থেকে পাঠক লেখক আর প্রকাশকদের পদচারণায় মুখরিত হয়েছে বই মেলার প্রাঙ্গন। তবুও কোথায় যেন এক শূণ্যতা বিরাজ করছে নীরবে নিবৃত্তে। সেই শূণ্যতার সন্ধানে এই স্মৃতিচারণ।

প্রতিবছর বইমেলায় প্রথম দিন ও শেষ দিন যেতাম আমি। সুযোগ হলে মাঝে মধ্যে যাওয়া হতো বন্ধুদের ফুসলিয়ে। কিন্তু এবার প্রায় অর্ধমাসই কেটেছে মেলায়। কারও অপেক্ষায় নয়, বরং প্রাণের টানে দুইপা বাড়িয়ে ছুটে যেতাম বইমেলায়। প্রায় অর্ধশত বই কিনেছি পড়ার জন্য। ছোটবেলা থেকে বইয়ের প্রতি ক্ষুধার মত যে বদঅভ্যাস বা নেশা তৈরি হয়েছে, সেটি এ বছর বেড়ে সারাবছরের একবেলার খাবারের টাকা ফুরিয়ে দিয়েছে। এ নেশার শেষ গন্তব্য বছর খানিক আগে একটা স্থির করলাম নিজেই। পড়া বইগুলোর শেষ ঠিকানা নিশ্চিত লক্ষ্মীপুরের ফরাশগঞ্জ গ্রামের ‘আলোকিত পাঠাগার’। বইয়ের প্রতি এই গোপন অভিসারের কথা শুনে এতক্ষণে নিশ্চয় আলোকিত পাঠাগারের পাঠকরাও  রোমাঞ্চিত হয়েছেন বইমেলার নতুন বই পড়ার জন্য। কেউ চাইলে আলোকিত পাঠাগারের পাঠকের জন্য বই দিয়ে তাদের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারেন।

বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে প্রতিদিনই পরিচিত অপরিচিত অনেক লেখকের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হতো। পড়ার বদঅভ্যাস থেকে লেখালেখির যে অভ্যাস নিজের অজান্তেই গড়ে উঠেছে, তাতে বই প্রকাশ করার মত দু:সাহস একবারও চিন্তা করতে পারছি না। তাই যেকোন লেখকের অটোগ্রাফসহ বই নিয়ে আমি যতটা খুশি হই, ঠিক ততটাই আমার যুক্তি, একজন লেখককে তার সৃষ্টির জন্য সন্মান দেখাতে এবং আরও উৎসাহ দিতে বই কেনার পাশাপাশি পারলে লেখকের একটি অটোগ্রাফ নিয়ে প্রত্যেকের কৃতজ্ঞতা দেখানো উচিত।

নজরুল মঞ্চের বটতলার ছায়ায় দাঁড়িয়ে থেকে উপলব্দি হতো এই মেলার প্রতিষ্ঠাতা চিত্তরঞ্জন সাহার কথা। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৮ ই ফেব্রুয়ারি চিত্তরঞ্জন সাহা মাতৃভাষার জন্য আত্মোৎসর্গকারী জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মৃতি রক্ষার্থে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বটতলায় একাই বইমেলা বসান। মাত্র ৩২ টি বই নিয়ে একটি চটের উপর বসে যে মেলার স্বপ্ন দেখেছেন চিত্তরঞ্জন সাহা, সেটি কি আজকের বইমেলা হতে পেরেছে? নাকি চিত্তরঞ্জন সাহার স্বপ্ন পূরণে অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছু কাল?
গতবছর বইমেলাকে ঘিরে সবার মনে যে অনাকাঙ্কিত আতঙ্কের জন্ম নিয়েছিল সেই আতঙ্ক থেকে মুক্তি পেল এবারের বইমেলা। কিন্তু ভবিষ্যতে কি আমরা সেই আতঙ্ক মুক্ত থাকবো?

জাগৃতি প্রকাশনীর কর্ণধার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর আবুল কাশেম ফজলুল হকের পুত্র প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন গত বছর অভিজিতের বই প্রকাশ করায় তাকে খুন করলো একটি উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠি। পুত্র হত্যার কথা শুনে ছুটে এসে সবার উদ্দেশ্যে ‘‘শুভ বুদ্ধির উদয় হোক’’ যে বাণী তিঁনি ছুড়ে দিয়েছেন সেটি কি সবাই ভুলে যেতে বসেছি? যদি তাই না হয় তাহলে একুশে ফেব্রুয়ারির দিনে পঞ্চগড়ের দেবিগঞ্জ উপজেলায় হিন্দু মঠের প্রধান যজ্ঞেসর রায়কে (৫০) কেন খুন হতে হবে? শহীদ মিনারে খালি পায়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে আমরা জুতা পায়ে কেন অপবিত্র করছি শহীদ মিনার? নিজেদের দাম্ভিকতা আর বাহুবলের কাছে ইতিহাস বার বার লজ্জিত হলেও আমরা কি একবারও লজ্জিত হতে পারি না?

কারো লেখা যদি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, গোত্র কিংবা রাষ্ট্রের অস্তিত্বের উপর আঘাত বা অসম্মান আনে তাহলে তাকে লেখা দিয়েই আহত করতে হবে। এই বুদ্ধি চর্চা প্রাশ্চ্যের দেশগুলোতে প্রলিত থাকলেও আমারা কেন পারি না? লেখার জবাব লেখা না হয়ে লেখার জবাব হত্যা দিয়ে হতে পারে না। এই বুদ্ধি বিদ্যা যার মনসতত্ত্বে সে সত্যিকারের দেশ প্রেমিকতো নয়, সত্যিকারের মানুষও হতে পারে না। তাই সবার মঙ্গলার্থে আবুল কাশেম ফুজলুল হক শুভ যে বাণীর সূচনা করেছেন তার জাগরণই পারে সমাজে শান্তির সুবাতাস বইতে।

আতঙ্ক ছড়িয়ে বইমেলার প্রতি মানুষের যে ভালোবাস, সেটি কখনো যে রোধ করা সম্ভব নয় তার প্রমাণ এবারের বইমেলা। ৪ মাসের সন্তান কোলে এক মাকে দেখলাম বই কিনতে এসেছেন মেলায়। ৭০ উর্ধ্বে বৃদ্ধ দাদু তার ছেলের সন্তানকে নিয়ে এসেছেন মেলায়। একটা দীর্ঘশ্বাস দিয়ে আমাকে বললেন আর বেঁচে থাকলে আসবো, না হয় এটাই আমার শেষ দেখা বইমেলা। ঘুরতে ঘুরতে অনেকটা ক্লান্ত হয়ে মেলার এককোণে ফুটপাতে বসে পড়লেন তিনি। আর তাঁর ৪ বছরের নাতি টানা হেছড়া করছেন তাকে একটি বই কেনার জন্য। কিন্তু কোন বই ই তার পছন্দ হয় না। বেকায়দায় পড়ে বৃদ্ধ লোকটি নাতিকে যতই বলেন পকেটে আর বই কেনার মত টাকা নাই, ততই নাতির চেছামেছি আরও বেড়ে যায়। বইয়ের প্রতি শিশুটির আগ্রহ দেখে ১৫০ টাকার একটি বই কিনে দিয়ে তাকে শান্ত করলাম আমি।

আবুল কাশেম ফজলুল হক জাগৃতি প্রকাশনীতে বসে দাদু নাতির এই দৃশ্যটি দেখে অনেকটা বাকরুদ্ধ হলেন। না বলা অনেক প্রশ্ন তার চোখে দেখতে পেয়েছি তখন। এই স্মৃতি তারও থাকতে পারতো। অহিংস মনোভাব যে সমাজ থেকে উঠে যায় সেই সমাজে স্মৃতি হয় মরিচিকা। মানুষের হৃদয় হয় পাথরের মত শক্ত। আর কান্না হয় শান্তি। সম্পর্ক বলতে তখন আর কিছুই থাকে না। বইয়ের শত্রু জগতের সবচেয়ে বড়  শত্রু। এই শত্রুরা কখনোই ক্ষমা পাওয়ার যোগ্যতা রাখে না। তাই শুভ বুদ্ধির উদয় যাদের মধ্যে এরই মধ্যে ঘটেছে তারাই বিচার করবে দীপনদের হত্যাকীদের।
বই লেখার জন্যে, প্রকাশ করার জন্যে যারা জীবন দিয়েছে এই পর্যন্ত, তাদের স্মৃতি বেঁচে থাকুক সবার হৃদয়ে। সবার স্মৃতি হোক শিশির ঝরা সবুজ ঘাসের উপর নিরাপদে প্রিয়জনের সাথে বই বুকে হেঁটে যাওয়ার মতো।
০১.০৩.২০১৬
ধৎরভপবহংঃধসভড়ৎফ@যড়ঃসধরষ.পড়স

No comments:

Post a Comment