Thursday, March 3, 2016

স্বাধীনতা পেয়েছি, স্বীকৃতি পাইনি

আরিফ চৌধুরী শুভঃ ‘অগ্নিঝরা মার্চ এলেই বুকের ভেতর বেজে উঠে স্বাধীনতার সুর। মুক্ত আকাশে একটা লাল সবুজ পতাকা উড়ানোর জন্য ত্রিশলক্ষ শহীদ যে জীবন দিয়েছেন তার বিজয় সত্যিকার অর্থে ধরা দেয় এই মার্চে। এ বিজয়ের স্বপ্ন দেখেছি আমরা বঙ্গবন্ধুর ৭ ই মার্চের ভাষণের পর থেকে। নারীদের উপর নির্যাতনের সীমা ছিল না। আমাদের ঘরটিও জ্বালিয়ে দিয়েছে। মাথার উপর চালের টিনে সেই আগুনের দাগ এখনো লেগে আছে। আমার গুলির অর্ডার করেছিল রাজাকার লিডার লনি চেয়ারম্যান। স্বাধীনতার পরেও তিন বছর বাড়িতে ঘুমাতে পারিনি। যেদিন খবর এলো লনি চেয়ারম্যানকে মেরে ফেলেছে নকশালরা, সেদিন থেকে বাড়িতে ঘুমাতে শুরু করেছি। আমার পায়ে যে গুলির দাগটি দেখেতেছিস তোরা, সেটি এই মার্চের ই দাগ। মৃত্যু থেকে বেঁচে আছি তোদের বাব ডাক শুনবো বলে।’ একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার জীবনের শেষ কথা এটি।

২০১২ সালের মার্চেই মুক্তযোদ্ধা বাবা এই কথাগুলো বলছিলেন আর টপটপ করে খাবার টেবিলে ঝরে পড়ছে তাঁর চোখের পানি। মা আর ভাইবোনরা খাবার টেবিলে অনেকটা নির্বাক হয়ে বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে আছি। ২০১২ সালের ২৪ ই মে এক দুঘটনায় পরাপরে চলে যান আমার গর্বিত বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মোমতাজ উদ্দিন আহমেদ। যিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দিয়েছেন, তাঁর মৃত্যুর  পর রাষ্ট্রিয় ভাবে শেষ মর্যাদাটুকুও দেওয়া হয়নি শুধু একটা স্বীকৃতির অভাবে। হায়রে স্বীকৃতি, হায়রে স্বাধীনতা! একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার সাথে এই আচরণ অত্যন্ত দুখ:জনক ও কখনই কাম্য হতে পারে না। এজন্য দু:খিত, লজ্জিত এবং অনুতপ্ত তাঁর সহযোদ্ধা ও লক্ষ্মীপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ এবং স্বাধীনতার প্রথম পতাকা উত্তোলনকারী আসাম অবদুরব। তাঁদের একটাই কথা ‘তাঁকে গেজেট ভুক্ত করার জন্য আমাদের পক্ষ থেকে যা দেওয়া দরকার আমরা সবই দিয়েছি।’

লক্ষ্মীপুর জেলার ১৮ নং কুশাখালী ইউনিয়নের ফরাশগঞ্জ গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ডা. মোমতাজ উদ্দিন আহমেদকে মুক্তযোদ্ধার তালিকায় গেজেট ভুক্ত করার জন্য বছর চারেক আগে একটি আবেদন জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে জমা দিয়েছেন আমার মা। এখন পর্যন্ত একটা ডিজি নাম্বার ২০০৬৫ আমরা পেয়েছি। রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি ভাবে কেউ খোঁজ পর্যন্ত নেয়নি আমাদের।

২০১৪ ও ১৫ সালে বাবাকে নিয়ে বিভিন্ন টিভি ও পত্রিকায় একাধিক প্রতিবেদন হয়েছে। বীর প্রতীক তারামান বিবি আর ডা. মোমতাজ উদ্দিনকে নিয়ে গতবছর মার্চে একটি বিশেষ প্রতিবেদনও করেছে একটি বেসরকারি চ্যানেল। প্রধানমন্ত্রী বরাবর আমার মায়ের একটি খোলা চিঠিও ছাপা হয়েছে পত্রিকায়। কিন্তু কোন আশার আলো দেখছি না আমরা।

মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এ সরকারের উদ্যোগ কম নয়। কিন্তু আলোর নিচে অন্ধকারের মত বেঁচে থেকে আমার বাবার মত অনেকই চলে গেছেন পারাপারে। ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাওয়ার আগেই আমার বাবার মতো সুবিধা বঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধাদের গেজেট ভুক্ত করার পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগে মরোণোত্ত্বর রাষ্ট্রিয় মর্যাদাসহ তাদের কবর সংরক্ষণের দাবি জানাচ্ছি।

প্রকৌশলী আরিফ চৌধুরী শুভ
মুক্তিযোদ্ধা. মুরহুম ডা. মোমতাজ উদ্দিনের সন্তান। ০৩.০৩.২০১৬

No comments:

Post a Comment